ছবির নাম: বহুরূপী (Bohurupi)
প্রকাশকাল: ৮ অক্টোবর, ২০২৪
পরিচালনা: শিবপ্রসাদ মুখার্জি ও নন্দিতা রায়
মুখ্য ভূমিকায়: শিবপ্রসাদ মুখার্জি, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, আবীর চ্যাটার্জি, ঋতাভরী চক্রবর্তী, প্রদীপ্ত মুখার্জি
সিনেমাটোগ্রাফি: ইন্দ্রনাথ মারিক
সংগীত: বনি চক্রবর্তী, অনুপম রায়, শিলাজিৎ মজুমদার
বিক্রমের ঘাড়ে চেপে বেতালের একের পর এক প্রশ্ন এবং বেঁধে দেওয়া শর্ত; মুখ খুললেই ফের স্বস্থানে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব আবার মুখ না খুললেই মৃত্যু! এই স্ববিরোধে অমীমাংসিত বিক্রম-বেতালের কাহিনি। মনে পড়ে যায় কোনও পরিচিত চিত্রনাট্যের কথা? পুষ্কর-গায়ত্রী পরিচালিত দক্ষিণী চলচ্চিত্রটির নাম ভিক্রম ভেদা। ২০১৭-তে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আর.মাধবন ও বিজয় সেতুপতি। এরই হিন্দি পুননির্মাণ ২০২২-এ, স্টার কাস্টে হৃত্বিক রোশন ও সঈফ আলি খান। চোর-পুলিশের পরিচিত বাইনারির সামনে এই চলচ্চিত্র ছুঁড়ে দিয়েছিল বিরাট প্রশ্ন, পাপ-পুণ্যের প্রচলিত সমীকরণকে নস্যাৎ করে প্রমাণ করেছিল যে বিচার ব্যবস্থায় ‘সহি’ আর ‘গলত’-এর ভেদচিহ্নটা খুব সূক্ষ্ম; চকের গুঁড়োর মতন একটা ফুঁ দিলেই ভ্যানিশ! একের পর এক কাহিনি শুনিয়ে যাওয়া ভেদা কার্যত বিক্রমের ঘাড়ে চেপে গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কোরাপশনের ইতিহাসকে সামনে তুলে আনে। নিজের তৈরি করা ‘ভাল’ আর ‘খারাপ’-এর বাইনারির জালে জড়িয়ে পড়া বিক্রম, পোকার মতন অসহায় হয়ে ওঠে এবং এক অমীমাংসিত প্রশ্নের ভিতর দিয়েই সমাপ্তি হয় সিনেমার গল্পের। (Cinema)

হঠাৎ ২০১৭-র এই প্রেক্ষাপটকে দিয়ে গৌরচন্দ্রিকার কারণ খুঁজতে হলে ২০২৪-এর একটি বাংলা সিনেমার দিকে তাকাতে হবে। বিক্রম প্রামাণিকের চূণীলাল হয়ে ওঠা আর তারপর ছ্যাঁচড়াপুরের ব্যাঙ্ক ডাকাত হিসেবে এক বহুরূপীর জন্ম… গল্পটা আপনাদের অবশ্যই চেনা কারণ এইমুহূর্তে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান না জানিয়েও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত বহুরূপী চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে একরকম তোলপাড় তুলে দিয়েছে। যে মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্টের আনাচ-কানাচ থেকে রসদ খুঁজে এনে একটা নির্দিষ্ট সীমায় নিজেদের বেঁধে ফেলেছিলেন এই পরিচালক জুটি, গতবছর রক্তবীজ পরিচালনার মাধ্যমেই সেই ছকের বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। সেখানে এইবছর বহুরূপী যে শিবপ্রসাদ-নন্দিতাকে একেবারে নতুন আঙ্গিকে চিনিয়েছে, তা এতদিনে স্পষ্ট। সামান্য এক মুহুরি কীভাবে গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে নাস্তানাবুদ করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, তাকে প্রায় নিঁখুত চিত্রনাট্যে নির্মাণ করেছেন শিবপ্রসাদ ও নন্দিতা। যে একঘেয়ে সংলাপ ও খাপছাড়া বিষয়কে কেন্দ্র করে একের পর এক বাংলা সিনেমা তৈরি হয়ে যাচ্ছিল, সেখানে এমন একখানা বাণিজ্যিক ছবি যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে নজরে পড়বে সংলাপ ও নির্মেদ দৃশ্য তৈরি; মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে এই সংলাপটি তো প্রায় মুখে মুখে ঘুরছে; “সরকার যদি তোমার মারে, তুমিও মারো শালা সরকারের”, এছাড়াও “পেন্নাম হই বড়বাবু… জগন্নাথের পাশে বলরাম না থাকলে কি মানায়?” গোছের তীক্ষ্ণ-তীব্র সংলাপ বহুদিন বাদে বাংলা সিনেমায় ফিরে এল। অভিনয়ে নবতম সংযোজন অবশ্যই শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কণ্ঠ চলচ্চিত্রটির কথা হয়তো মনে আছে অনেকেরই। শিবপ্রসাদ যে কতটা উঁচুদরের অভিনেতা, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ কণ্ঠ-এ তাঁর অভিনয়। সেই অভিনেতা শিবপ্রসাদের পরিপূর্ণতার নিদর্শন হয়ে থাকল বহুরূপী; অনেকটা সেই কাহাবতের মতন, “সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার!” বিশেষ প্রশংসাযোগ্য অভিনয় অবশ্যই কৌশানী মুখোপাধ্যায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়, ঋতাভরীসহ সকল সহ-অভিনেতাদের। ‘সফল অভিনেতার পিছনে পরিচালকের বিশেষ ভূমিকা থাকে’—এই কথাটা চলচ্চিত্রটির ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। আবীর ও ঋতাভরীর ‘রোমান্টিক উপাখ্যান’ দেখানোর প্রয়োজনে দুটি গানের ব্যবহার একটু অতিরিক্ত মনে হতে পারে, তবে ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটি প্রমাণ করেছে, একটি ‘আইটেম সং’-কেও কতটা উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যায়!
পুরনো বছরের নতুন ফেলুদা– ফেলুদা ফেরত রিভিউ
সাধারণ মানুষের ‘অসাধারণ’ হয়ে ওঠার গল্প বহুরূপী, কিন্ত বহু রূপে সম্মুখে উপস্থিত ব্যাঙ্ক ডাকাতের পূর্ব পরিচয়ে নামটি বিক্রমই হতে হল কেন? আর কেনই বা বলা হল, আসল বহুরূপী বড়বাবু থুড়ি সুমন্ত ঘোষাল? ধান ভানতে শিবের গীত শুরু করেছিলাম। ২০১৭-র সেই ঘাড়ে চেপে বসা ভেধা যখন নানান প্রশ্নে জর্জরিত করে দিচ্ছে ভিক্রমকে তখন, শেষপর্যন্ত গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অপরাধ সামনে চলে আসে। সম্মুখে থেকেও ভেধা কিন্তু অধরাই থেকে যায় বিক্রমের কাছে। অধরাকে ধরার কথা আছে বহুরূপী-র শেষ গানে কিন্তু বিক্রম প্রামাণিক কি আবারও সেই বিক্রম-বেতালের কাহিনির কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায় না?
রিভিউ: রাজা রবি বর্মা: দুজন পরিচালক, দুটি ছবি
একটার পর একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতি আর তারপর বড়বাবু সুমন্ত ঘোষালকে ফোন করে কিছু অসংলগ্ন কথা বলা; ডাকাতির পর চোখের সামনে বহুরূপী সেজে ঘুরে বেড়ানো আর শেষপর্যন্ত ধরা পড়ে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সব দুর্নীতির মুখোশ টেনে খুলে, চোর-পুলিশের পরিচিত সমীকরণকে বিরাট প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে, একই সমতলে পুলিশি ব্যবস্থাকে টেনে নামানোর ঘটনাটা কি একবারের জন্যেও দক্ষিণী চলচ্চিত্র ভিক্রম ভেদা-কে মনে করিয়ে দেয় না!

অনুসরণ আর অনুকরণের ভিতর থাকা ‘স’ আর ‘ক’-এর সূক্ষ্ম তফাতটা বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই ধরে ফেলবেন। শিবপ্রসাদ ও নন্দিতা সেই বুদ্ধিমান শিক্ষানবিশ। তাই পুরনো বই নতুন মোড়কে বিক্রি করার পরিবর্তে তাঁরা মোড়কটাও পাল্টিয়েছেন কিঞ্চিত। বহুরূপী কোনওভাবেই ভিক্রম ভেধা-র বঙ্গীকরণ হয়নি। এর ভিতর মিশেছে বাংলার জল-হাওয়া-মাটির স্বাদ। এ ব্যতীত সকলেরই জানা যে ঘটনাটি আদতে একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনেই নির্মিত। বাকি রইল সেন্টিমেন্টের কাটাছেঁড়া। এক আদর্শবান পুলিশ অফিসার তাঁর কর্ম ও মানসিকভাবে অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি দায়বদ্ধ; এতটাই দায়বদ্ধ যে কর্মজীবন বিপর্যস্ত হলেও সে তার স্ত্রীর প্রতি নিজের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিতে পারে। একটু বেশি সেন্টিমেন্টাল নয় কি বিষয়টা? কথায় আছে, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো’; গোটা চলচ্চিত্রের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এতগুলো স্তর থাকা সত্ত্বেও কিন্তু সিনেমা ‘হ্যাপি এন্ডিং’; এই সমাপ্তি কি বাঙালি মধ্যবিত্তের কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি-ই নয়? তেমনই সিনেমার পরীর বাইপোলার সিনড্রোম। আলাদা করে এই বিশেষ মানসিক অসুস্থতা কি তবে সেই সেন্টিমেন্টাল চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যেই নির্মিত? এ ব্যতীত এই বিশেষ অসুখটির আলাদা কোনও গুরুত্ব সিনেমার প্রেক্ষিতে অন্তত খুব একটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি। শেষ দৃশ্যের চলচ্চিত্রায়ন যেন একটু বেশিই দীর্ঘ মনে হতে পারে। নাটকীয় একটা মুহূর্ত যেখানে ক্লাইম্যাক্সে চমক সৃষ্টি করছে, সেখানে হঠাৎই পুলিশকে রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে ব্যর্থ পালানোর প্রচেষ্টাটি কিছুটা হাস্যকর মনে হতে পারে। সেখানে প্রতিবন্ধী কার্ড ওইভাবে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার পুড়িয়ে ফেলছেন, তাও তদন্তের আগেই, এটিও প্রায় অবিশ্বাস্য!

বহুরূপী চলচ্চিত্রটি নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তাই থেকে যায় এবং থাকাটাই উচিত। প্রশ্নাতীত কোনও মাধ্যমই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সবশেষে একটি দৃশ্যে বড্ড বেশি খটকা লাগে, একজন ‘মহিলা বহুরূপী’-র পোশাক খুলে সার্চ করার নির্দেশ কি কোনও ‘পুরুষ’ পুলিশ অফিসার দিতে পারেন? ঝিমলিকে সার্চের নির্দেশ কিন্ত সুমন্ত ঘোষাল আর তার টিমই দেয়! এই সবটুকু মিলিয়েই বলা চলে, বহুদিন বাদে বাণিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্রে মনোরঞ্জন এবং ভাবনার রসদটুকু বহুরূপী জুগিয়েছে। এমন হিউমার ও উইট মেশানো সংলাপ, ‘খুড়ো’ ওরফে প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের অসাধারণ স্ক্রিন প্রেজ়েন্স, শিবপ্রসাদের চোখ-মুখের তীব্র অভিব্যক্তি, আবীরের সার্কাস্টিক ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলার ভঙ্গি, বারবার ‘বাবি, বাবি’ বলার মধ্যে থাকা ঋতাভরীর আশ্রয় খোঁজা আর ঝিমলির ‘ময়দামুখো’-র ভিতরে থাকা সংসার গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং অবশ্যই ননীচোরা দাস বাউলের কণ্ঠে বহুরূপীদের গান ও বাংলার বহুরূপী সংস্কৃতির ডিটেলিং; এইসবের ভিতরে হিন্দি বা ইংরেজি সিনেমার ‘ক্রাইম-থ্রিলার’-থেকে সরাসরি তুলে আনা কোনও উপকরণ নেই। নেই বিকট চেহারার কোনও ‘ভিলেন’ আর্কেটাইপ বা ‘সিক্স প্যাক’ চেহারার কোনও ‘হিরো’ কিংবা ‘ফিগার কনসাস’ কোনও হিরোইনের লাস্য; যা আছে তা একান্তই বাংলার ঘরোয়া রান্নার উপকরণ আর তার সঙ্গে মশলার অনবদ্য মিশ্রণ। সেই রান্না চেখে না দেখলে কিন্ত কেঁন্দে মরে যাবেন!